লা নুই বেঙ্গলী ( বাংলার রাত) বইয়ের রিভিউ

বইঃ লা নুই বেঙ্গলী

লেখকঃ মির্চা এলিয়াদ
ধরণঃ অটোবায়োগ্রাফিক্যাল রোমাঞ্চ

꧁ দৈহিক স্মৃতি চলে যায়, সম্পুর্ন দৈহিক অন্তরঙ্গতার স্মৃতিও ম্লান হয়ে যায়। যেমন যায় আমাদের ক্ষুধা-তৃষ্ণার স্মৃতি। ꧂

“সালটা ১৯২৯। মৈত্রেয়ীর সাথে কবে প্রথম দেখা হয়েছিলো মনে নেই। তাই ঠিক কোন জায়গা থেকে শুরু করব বুঝতে পারছিনা।” এমন করেই শুরু এই অটোবায়োগ্রাফিক্যাল রোমাঞ্চ। গল্পের নায়ক লেখক নিজেই। নায়িকা মৈত্রেয়ী দেবী। তাদের দুজনের প্রেমের উপাখ্যান এই উপন্যাস।

ইন্জিনিয়ার নরেন্দ্র সেন চালিত একটি কম্পানির কর্মচারি এ্যালেন। যাকে কাজের জন্য পাঠানো হয় ভারতের একটা জলাবদ্ধ স্থানে। সেখানে এ্যালেনের ম্যালেরিয়া হয়ে যায়। তাকে কলকাতা ফেরত এনে একটা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিছুটা সুস্থ হলে মিঃ সেন তাকে তাদের বাড়িতে থাকার জন্য আহ্বান জানান। এ্যালেন সে বাড়িতে ওঠে। তারপর মিঃ সেনের মেয়ের সাথে একটা সম্পর্ক তৈরী হয়ে যায়। যেটা পরবর্তিতে ভালোবাসায় রুপ নেয়। মৈত্রেয়ী শ্যাম বর্নের সুঠাম দেহের তরুনী। ১৫-১৬ বয়স। রবীন্দ্রনাথের খুব বড় ভক্ত। আর রবীন্দ্রনাথের প্রিয়দের মধ্যে একজন। কত ছুটি সে শান্তিনিকেতনে কাটিয়েছে তার হিসেব নাই। কবিতা লেখায় তার পারদর্শিতা ভীষন। ধীরে ধীরে পরিচয় বাড়ে মৈত্রেয়ী দেবীর সাথে। এক সময় সেটা প্রেমে রুপান্তরিত হয়। মৈত্রেয়ী আর অ্যালেনের প্রেম ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। মৈত্রেয়ী যদিও অনেকবার অ্যালেনকে বলে তার পরিবার এটা মানবেনা। এবং তার পরিবার অ্যালেনকে দত্বকপুত্র হিসেবে নিতে চায়। তাই তাদের মেলামেশা ভাই-বোনের মতো হওয়া উচিৎ। কিন্তু না পারে মৈত্রেয়ী না পারে অ্যালেন এটাকে মানতে। কিছুটা দূর মৈত্রেয়ী ভাবতো একটু চুম্বন, আলিঙ্গন এসমস্থ শালীনতার মধ্যে পড়ে। বা ভালোবাসায় চলে। কিন্তু তার অধিক কিছু তার মনে পাপ বোধের জন্ম দিত। কিন্তু কিছু সময় পরে সে-ই পড়ে যায় সেই মায়া জালে নিজের ইচ্ছায়। ছবু মৈত্রেয়ী দেবীর ছোট বোন। তার সামনেই একদিন এই ভালোবাসার প্রকাশ ঘটে নদীর পাড়ে। তারপর মিসেস সেন, মিঃ সেন সব জেনে বের করে দেয় অ্যালেনকে। অথচ অ্যালেন হিন্দু ধর্ম গ্রহন করতে চেয়েছিলো মৈত্রেয়ী কে বিয়ে করার জন্য। অ্যলেন একটা পাহাড়ি বাঙ্গলো তে অবস্থান রত থাকা কালিন পরিচয় হয় জেনীয়া আইজ্যাক এর সাথে।

যাইহোক এটুকু ছিলো একটু সারমর্ম। ভেতরের কাহিনি আরো করুণ।

কিন্তু কথা হচ্ছে আপনি কেন বইটি পড়বেন‼️

এটাতে প্রেমের কথা ছাড়া আর কী আছে? কেনই বা অ্যালেনকে তারা মেনে নিলোনা? মৈত্রেয়ী দেবীর এত শোচনীয় অবস্থার পরও তাদের মন কেন গললোনা?

꧁ ট্রাডিশন অনুযায়ী বা সংসারের প্রচলিত নিয়ম অনুসারে যা হয়না, সেই কামনার ভেতরে কখোনো স্থায়িত্ব বা আনন্দ জন্ম নেয়না। ꧂

কথাটা ছিলো মিসেস সেন এর। বইটিতে দেখানো হয়েছে কিভাবে একটা প্রেম শুরু থেকে চরমে ওঠে। কিভাবে যার উপস্থিতি ভালো লাগতোনা তাকেই সবচেয়ে কাছের মনে হয়। কিভাবে সেই প্রিয় মানুষটার সামন্য একটা ড্রাইভারের সাথে আড়ালে কথোপকথন বুকে ছ্যাঁত করে ওঠায়। যে মেয়েটা রবীন্দ্রনাথের আদর্শে থেকে জাগতিক প্রেম কে তুচ্ছ মনে করত সে কিভাবে আর কেনই প্রতিরাত অ্যালেনের সাথে কাটাতো। অ্যালেনের সাথে লুকিয়ে প্রেম, চিঠি বিনিময়, লাইব্রেরিতে গোপনে দেখা করা সহ আরো অনেক কাহিনী মাতিয়ে রাখবে বইটি পড়ার সময়। জানতে পারবেন কিভাবে একটা ভিন দেশি মানুষ যে কিনা যেকোন পার্টিতে মেয়ে নিয়ে মত্য থাকতো সে কিভাবে সব ছেড়ে দেয়। কিভাবে একটা মেয়ে ওসব জানার পরও ভুলতে পারেনা আর ভালোবেসেই যায়। এসবের পর মৈত্রেয়ী দেবীর আরো শোচনীয় অবস্থা, তার পরিবারের উপর নেমে আমা দুর্দশা, ছোট্ট ছবুর পরিনতি সহ একটা ভারতীয় সংস্কৃতিমনা পরিবারের সমস্থ চিত্রই ফুটে উঠেছে বই টিতে। সেই সময়কার ভারতীয় অবস্থা, ব্রিটিশ দের কার্যকালাপ আর দুজন ভিনদেশীর প্রেম সমন্ধে সকল কিছু জানতে অবশ্যই পড়া উচিৎ বইটি। পড়তে শুরু করলে ওটার ভেতরেই ঢুকে পড়বেন আশা করি।

অনেক প্রেমও একটা সময় হারিয়ে যায়। বা হারিয়ে ফেলতে হয়। হোক সেটা অন্য কিছুতে মত্য থেকে বা হোক শত ভালোবাসার মানুষটিকে বিনা কারনে ঘৃনার বস্তু বানানোর মাধ্যমে। যখন পরিনতি সায় না দেয় তখন ভূলে থাকার মাঝেই মঙ্গল।

꧁ আমার এখন কেবল একটাই ইচ্ছে, ও ভুলে যাক, ও যেন আমার জন্য আর কষ্ট না পায়। আমি এমন কিছু করি যাতে সে আমাকে ঘৃনা করে ভুলে থাকতে পারে। ꧂

পার্সোনাল রেটিংঃ ৩.৫*

[বিঃদ্রঃ এটা অটোবায়োগ্রাফি না হলে ৪.৫* দিতে বাধতোনা আমার। লেখার ধরন বা লেখনী সমন্ধে কোনো ক্ষোভ নাই আমার। আছে লেখক সমন্ধে। মৈত্রেয়ী দেবী অনেক কিছু করেছেন। তার বিপরীতে শেষের বেলা অ্যালেনের একটা ভুল কাজ করার কারনে খুব রাগ হচ্ছে। জানিনা লেখক আরো কিছু লুকিয়েছে কিনা। কিন্তু যেটুকু বলেছে আর বের করে দেওয়ার ২-৩ মাসের ভেতর আবার যে কাজ করেছে তাতে ঘৃনা হচ্ছে। মৈত্রেয়ী দেবীর কৃত কাজ শেষ বারের মতো একটু ভালোবাসা নিয়ে ধৈর্য ধরে দেখলে হয়তো সুখে থাকত মৈত্রেয়ী। ]

আপনারা সবাই ” বই জিজ্ঞাসা ফেইসবুক গ্রুপে জয়েন হতে পারেন।

Leave a Reply