আইন জানুন আইন মানুন পর্ব ৮: FIR কী ? FIR দায়ের করার পদ্ধতি

অপরাধী ও সংঘটিত আমলযোগ্য অপরাধের বিস্তারিত বিবরণসহ শাস্তি দাবি করে বা আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের নিমিত্তে থানায় অপরাধের সংবাদ লিপিবদ্ধ করাকে এজাহার বলে, যা FIR বা First Information Report বা প্রাথমিক তথ্য বিবরণী নামেও পরিচিত। অপরাধ সম্বন্ধে এ বিবরণ প্রথম দেওয়া হয় বলে একে প্রাথমিক তথ্য বিবরণী বলে। আমলযোগ্য অপরাধ (Cognizable offence) হচ্ছে সেই অপরাধ, যে অপরাধের দরুন অভিযুক্তকে বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার করা যায়। এজাহার লিখিত বা মৌখিকভাবে করা যেতে পারে। মৌখিক এজাহারের ক্ষেত্রে থানার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বিনামূল্যে ঘটনার বিবরণ লিপিবদ্ধ করে দিবেন এবং উক্ত ঘটনার বিবরণ তিনি তথ্য প্রদানকারীকে পড়ে শুনিয়ে আপত্তি না থাকলে তাতে তার স্বাক্ষর নিবেন। আর যদি তথ্য প্রদানকারী এতে কোনো সংশোধন আনতে চান, তবে তা আনার পর স্বাক্ষর নিবেন। অন্যদিকে লিখিত এজাহারের বেলায় সংঘটিত অপরাধের বিস্তারিত বিবরণ স্বাক্ষরসহ দরখাস্ত আকারে সংশ্লিষ্ট থানায় দাখিল করতে হয়। প্রাপ্ত দরখাস্তের তথ্যাদি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এজাহারের জন্য নির্ধারিত বিপি ফরম ২৭ (বাংলাদেশ পুলিশ ফরম) তুলে মামলার জন্য প্রয়োজনীয় পরবর্তী পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করেন। তবে কোনো কারণে থানা এজাহার নিতে না চাইলে সরাসরি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে গিয়ে নালিশি (Complaint Register) মামলা রুজু করা যাবে। ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধির (সিআরপিসি) ১৫৪ ধারায় এজাহার সম্পর্কে বলা হয়েছে, কোনো থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (OC) নিকট কোনো আমলযোগ্য অপরাধ সংঘটিত হওয়া সম্পর্কে কোনো সংবাদ মৌখিকভাবে প্রদান করা হলে তিনি বা তার নির্দেশক্রমে অন্য কেউ সাথে সাথে তা লিখে তথ্য প্রদানকারীকে পড়ে শুনাবেন এবং তথ্য প্রদানকারীর স্বাক্ষর নিবেন। লিখিতভাবে প্রদত্ত সংবাদের ক্ষেত্রেও তথ্য প্রদানকারী স্বাক্ষর করবেন। এই তথ্যবিবরণী উক্ত অফিসার সরকার কর্তৃক নির্দেশিত (বিপি ২৭) ফরমে লিপিবদ্ধ করবেন। তবে অপরাধের সংবাদটি বিস্তারিত না হলেও তা গ্রহণযোগ্য হবে এবং পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা প্রয়োগকারী বাহিনী ঘটনা আমলে নিয়ে তদন্ত করতে পারবে। যেকোনো ব্যক্তিই অপরাধ সংঘটন স্থলের নিকটবর্তী থানায় এজাহার রুজু করতে পারেন। এর জন্য তাকে ক্ষতিগ্রস্ত হবার প্রয়োজন নেই। তবে আমল-অযোগ্য অপরাধের ঘটনা তদন্ত করতে বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটের পূর্বানুমতির প্রয়োজন পড়ে। অভিযোগ থানায় আসার পর ক্রমানুসারে প্রতিটি অভিযোগের একটি নম্বর প্রদান করতে হবে। ইংরেজি মাসের প্রথমদিন মধ্যরাতের পরে কোনো অভিযোগ এলে সংশ্লিষ্ট অপরাধ যখনই ঘটে থাকুক না কেন, তা ওই মাসের প্রথম বা ১ নম্বর অভিযোগ হিসেবে গণ্য হবে এবং ওই মাসের শেষ দিনের মধ্যরাতের আগে সর্বশেষ অভিযোগটি সর্বশেষ নম্বর ভুক্ত হবে। অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি প্রজাতন্ত্রের কোনো কর্মচারী হন, তাহলে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের বিষয়টি পুলিশ সুপার অভিযুক্তের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে পাঠাবেন।

এজাহারে যেসব বিষয় উল্লেখ করতে হয় : ঠিকমতো এজাহার করতে না পারায় অনেকেই বাধ্য হয়ে টাকার বিনিময়ে দালালের সাহায্য নেন। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী না হওয়ায় এজাহারে এ সকল দালালেরা ঘটনার প্রকৃত বিবরণ তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়। ফলস্বরূপ এজাহার দুর্বল হয়ে যায় এবং আসামির বিপক্ষে মামলা প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এজাহার হলো ফৌজদারি মামলার ভিত্তি। তাই এজাহারে অপরাধী ও অপরাধের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ সতর্কতার সঙ্গে তুলে ধরতে হয়। এজাহারে তাই (১) সুস্পষ্টভাবে অপরাধীর নাম ও ঠিকানা (জানা থাকলে) উল্লেখ করা; (২) অপরাধের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা যৌক্তিকভাবে লিপিবদ্ধ করা; (৩) অপরাধ সংঘটনের তারিখ ও সময় উল্লেখ করা; (৪) অপরাধ সংঘটনের স্থল উল্লেখ করা; (৫) অপরাধ সংঘটনের কোনো পূর্ব সূত্র বা কোনো কারণ থেকে থাকলে তার বর্ণনা তুলে ধরা; (৬) সন্দিগ্ধ ব্যক্তিদের সম্পর্কে ধারণা দেয়া; (৭) অপরাধ পরবর্তী অবস্থা যেমন- সাক্ষীদের আগমন, আহত ব্যক্তির চিকিৎসা ইত্যাদি সম্পর্কে বর্ণনা; (৮) সাক্ষীদের নাম, ঠিকানা ইত্যাদি উল্লেখ করা; (৯) অপরাধীদের কেউ বাধা দিয়ে থাকলে তার ধারাবাহিক বর্ণনা করা; (১০) কোনো বিষয় তাৎক্ষণিকভাবে লেখা সম্ভব না হলে পরবর্তীতে সে বিষয়টি সংযোজন করা হবে এমন একটি কৈফিয়ত রাখা প্রভৃতি বিষয়াবলি উল্লেখ করা জরুরি। এছাড়া এজাহার দাখিলে কোনো কারণে বিলম্ব হলে যথাযথ ও যৌক্তিক কারণ দর্শানো এবং কোনো ঘষা-মাজা, কাটা-কাটি না করা ভালো। যদিও ফৌজদারি অপরাধের কোনো তামাদি নেই, তথাপি এজাহার দায়েরে বিলম্ব মামলার গুণগতমান বিনষ্ট করে।
এজাহারের ৫টি কপি করতে হয়। এরমধ্যে মূল কপি কোর্টে, প্রথম কার্বন কপি পুলিশ সুপার-এর নিকট, দ্বিতীয় কার্বন কপি থানায়, সাদা কাগজে অতিরিক্ত কপি সার্কেল সহকারী পুলিশ সুপারের নিকট এবং সাদা কাগজে অতিরিক্ত কপি এজাহারদাতার নিকট প্রেরণ করতে হয়।

এজাহার রুজুর পর পুলিশি দায়িত্ব :পুলিশ রেজুলেশন অব বেঙ্গল (পিআরবি), ১৯৪৩-এর ২৪৩, ২৪৩(চ) ও ২৪৫ প্রবিধান এবং ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮’র ১৫৪ ধারা অনুযায়ী, আমলযোগ্য অপরাধের সংবাদ শুনে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট পুলিশ অফিসার FIR গ্রহণ হতে বিরত থাকতে পারবেন না। এজাহার হলো জিআর (General register) বা পুলিশি মামলার মূল ভিত্তি। তাই আমলাযোগ্য কোনো অপরাধের সংবাদ পাবার সাথে সাথে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫৭ ধারানুসারে তদন্ত আরম্ভ করতে হবে। সংবাদদাতা সংবাদটি লিখিতভাবে দিতে না চাইলে অথবা তা লেখা হলে তাতে স্বাক্ষর দিতে না চাইলে সংবাদটি জিডিভুক্ত করে পরবর্তী ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রাথমিক তথ্যদাতা টেলিফোন/ফ্যাক্স/ই-মেইল বা যোগাযোগের অন্য কোনো মাধ্যম ব্যবহার করে এমনকি সংবাদপত্রের মাধ্যমে অবগত হয়ে কোনো আমলযোগ্য অপরাধের সংবাদ দিলে সংবাদদাতাকে থানায় এসে এজাহার রুজুর জন্য বলতে হবে এবং তার নাম, ঠিকানা, খবরের উৎস প্রভৃতি লিপিবদ্ধ করতে হবে। সংবাদদাতা থানায় না এলে সংবাদ গ্রহণকারী অফিসার নিজেই বিষয়টি FIR করে ব্যবস্থা নিবেন (ধারা-১৬৭)। অপরাধ সংঘটনের সংবাদটি কোনো আমলযোগ্য ঘটনার না হলে সেটি জিডি হিসেবে এন্ট্রি করে পরবর্তী ব্যবস্থা নিতে হবে। সংবাদদাতার স্বাক্ষর না দেবার কারণে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম বন্ধ রাখা যাবে না। সংবাদ পেলে ডাক্তারি কিংবা অন্যকোনো প্রয়োজনীয় সার্টিফিকেট না পাওয়ার কারণে এজাহার বিলম্বিত করা যাবে না। ম্যাজিস্ট্রেট আমলযোগ্য কোনো অপরাধ তদন্ত করার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দিলে ম্যাজিস্ট্রেটের প্রেরিত লিখিত বার্তাই পুলিশ কর্মকর্তা এজাহার রূপে গণ্য করে পদক্ষেপ নিবেন।

এজাহারের সাক্ষ্যগত মূল্য : এজাহার হলো মামলার প্রারম্ভিক দলিল। এজাহার যেহেতু কোনো অপরাধ সংঘটনের পর পরই দায়ের করা হয়, তাই এজাহার হলো সংঘটিত অপরাধের একটি বাস্তব চিত্র। তাছাড়া এজাহারের ওপর ভিত্তি করেই মামলার তদন্ত কাজ প্রাথমিকভাবে পরিচালিত হয়। এটি যেকোনো মামলার প্রধানতম লিখিত দালিলিক সাক্ষ্য আর এ কারণেই মৌলিক সাক্ষ্য না হয়েও ফৌজদারি মামলায় এজাহারের গুরুত্ব অপরিসীম। এজাহারদাতা এবং এজাহারগ্রহীতার (সংশ্লিষ্ট পুলিশ অফিসার) মধ্যে অন্তত একজনকে মামলার সাক্ষ্য পর্বে আদালতে এসে সাক্ষ্য দিয়ে তা প্রমাণ করতে হয়। অন্যথায় মামলা দুর্বল হয়ে যায়। ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইনের ১৪৫ ধারানুসারে, এজাহারকে সাক্ষীর সাক্ষ্যের সত্যতা কিংবা অসংগতি প্রমাণের জন্য ব্যবহার করা যায়। অধিকন্তু, এজাহারের বক্তব্যের সঙ্গে সাক্ষ্য পর্যায়ে এজাহারকারী/গ্রহীতার বক্তব্যে অসংগতি ধরা পড়লে অপরাধ প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। অপরাধের ধরন ও অপরাধীদের আচরণ এজাহারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলেও মামলার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

জিডি ও এজাহারের মধ্যে মূল পার্থক্য :জিডি করা হয় অপরাধ সংঘটনের আশঙ্কা থেকে। অপরদিকে এজাহার করতে হয় অপরাধ সংঘটনের পরপর। এজাহার কেবল আমলযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রেই দায়ের করা যায়, কিন্তু জিডি যেকোনো অপরাধ এমনকি কোনো কিছু হারিয়ে গেলেও করা যায়।

শেষ কথা : ফৌজদারি মামলার বিচারে এজাহার অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ একটি সাক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই বিচারকালে এজাহারে কোনো ত্র“টি ধরা পড়লে তা আর সাধারণত সংশোধন করা যায় না। এজাহারের ওপর মামলার ভাগ্য অনেকখানি নির্ভর করে। একটি শক্তিশালী এবং নিরেট এজাহার একদিকে যেমন আইনের শত ব্যাখ্যার মধ্যেও ন্যায় বিচার নিশ্চিত করতে পারে, অন্যদিকে ঠিক তেমনি দুর্বল ও অসঙ্গতিপূর্ণ এজাহার মামলার গুণগত মান নষ্ট করে বিচার বিলম্বিত করে আসামিদের জন্য বেকসুর খালাসের ব্যবস্থা করতে পারে। তাই এজাহার দায়ের করার পূর্বে যথাযথ সতর্কতা অবলম্বনের পাশাপাশি এ বিষয়ে পুলিশের জন্য প্রশিক্ষণ ও বর্তমান প্রক্রিয়াটি সংশোধন করে এজাহারের জন্য জন-বান্ধব ছক প্রবর্তন করাও অত্যাবশ্যক। তাহলে অন্তত প্রক্রিয়াগত ত্র“টির কারণে আর কোনো ব্যক্তিকে বিচার বঞ্চিত হয়ে চোখের জল ফেলতে হবে না।

Leave a Reply