বিজ্ঞানের ৩টি অসাধারণ কিছু উদ্ভাবন

1. রক্তের দ্বারা বয়স নির্ণয় : 

রক্তের দ্বারা বয়স নির্ণয় করা যায় একথা শুনে অনেকেই অবাক হবেন এবং বলবেন, এটি বিজ্ঞানবিষয়ক কোনো খোশগল্প হয়তো? আসলে তা নয়। সম্প্রতি একদল বিজ্ঞানী রক্তের দ্বারা বয়স নির্ধারণের এক কৌশল উদ্ভাবন করেছেন। একসময় মানুষ মারা গেলে যদি তিনি বেওয়ারিশ লাশ হতেন তখন হাড়ের মধ্যে যে রিং আছে তার বৃদ্ধি গণনা করে বয়স নির্ধারণ করা হতো। আজো আমাদের মতো দেশে তাই করা হচ্ছে।

কিন্তু এ কাজ করার জন্য মৃত ব্যক্তির দেহে অস্ত্রোপচারের উদ্যোগ নিতে হয় যা অনেকটা ঝামেলাতো বটেই ব্যয়সাপেক্ষ বিরক্তিকর কাজ। অথচ মানুষ নয় যেকোনো প্রাণীর শরীর থেকে এক ফোঁটা রক্ত নিয়ে অনায়াসে তার বয়স নির্ণয় করা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের লোয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানী মার্ক হ্যাসম্যানের নেতৃত্বে একদল বিজ্ঞানী সম্প্রতি এই পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন। আপাতত তারা এই পদ্ধতির কোনো নামকরণ করেননি।

এই পদ্ধতিতে প্রাণীদেহের এক ফোঁটা রক্ত নিয়ে এর সেল ডিভিশনকে সম্প্রসারিত করে দেখা হয় টিলোমেরাস নামক ক্রোমজোমগুলোর শেষে পুনরাবৃত্তিমূলক সিকোয়েন্সগুলো খুঁজে। এ সময় এ কাজে ব্যবহৃত কৌশল সর্বশেষ সিকোয়েন্সগুলো সঙ্গত কারণেই খুঁজে পায় না। তখন ধরে নেয়া হয় প্রাণীদের বয়স বাড়ার কারণে টিলোমেরাস ছোট হয়ে গেছে। টিলোমেরাস ছোট হয়ে যাওয়ার ওপর ভিত্তি করে বিজ্ঞানীরা বয়স বাড়ার বিষয়টি নির্ধারণ করেন।

এ বিজ্ঞানীরা গবেষণার সময় অশ্বাকৃতির এক ধরনের ছোট প্রাণীর (জেব্রা ফিনচ) শরীর থেকে রক্ত নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। তাদের পরীক্ষা শেষে প্রাণীটির বয়স ১০ বছর নির্ণয় করা হয়েছিল। এরপর অন্যান্য কৌশল প্রয়োগ করে এই প্রাণীর বয়স নির্ণয় করা হলে একই ফলাফল পাওয়া গিয়েছিল। তা থেকেই বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন এটি একটি কার্যকর পদ্ধতি।

2. বায়ুমন্ডলে বছর প্রতি কার্বন ডাই-অক্সাইড বৃদ্ধির পরিমাণ ১% : 

বিজ্ঞানীরা সাম্প্রতিক এক গবেষণার মাধ্যমে জানতে পেরেছেন বায়ুম-লে প্রতি বছর কার্বন ডাই-অক্সাইড বৃদ্ধির পরিমাণ ১%। বেলজিয়ামের রয়েল অবজারভেটরি এবং ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি অব লৌভ্যানের বিজ্ঞানী ওলিভিয়ার ডি ভাইরনের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণার বিজ্ঞানীরা এই তথ্য-উপাত্ত প্রমাণ করেন।

এই বিজ্ঞানীদের মতে, বায়ুম-লে কার্বন ডাই-অক্সাইড বৃদ্ধির এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে প্রায় ৭০ বছর পর বায়ুমন্ডলে বিদ্যমান কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ দ্বিগুণ হয়ে যাবে। নির্ভুলভাবে পরিমাপের ফলে দেখা গেছে।

কার্বন ডাই-অক্সাইড প্রতিদিন প্রায় ১০ মাইক্রোসেকেন্ডের সমান বৃদ্ধি পায়। বিশ্বে প্রতিদিন যে পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড সৃষ্টি হয় এবং প্রাকৃতিক কারণে তা শোষণ এবং অন্য বস্তুতে রূপান্তরকরণ হয় এতে ভারসাম্যতা বজায় না থাকায় এসব কার্বন ডাই-অক্সাইড অপরিবর্তনীয় অবস্থা বায়ুম-লে ভেসে বেড়ায়। তাছাড়া বায়ুম-লে উক্ত হাওয়ারও সৃষ্টি হয়। এর ফলে মরু অঞ্চলে জমে উঠা বিশাল বরফগুলো উত্তপ্ত হাওয়ার সংস্পর্শে এসে ভারসাম্যহীন অবস্থায় গলতে শুরু করে। এই অস্বাভাবিকতার কারণে পূর্ব থেকে পশ্চিমে বা পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে হাওয়া দ্রুতবেগে ছুটে যায়।

গরম হাওয়া পৃথিবীর কুমেরু অঞ্চলে গিয়ে ঠা-া হাওয়ার সাথে মেশার ফলে বায়বীয় কার্বন ডাই-অক্সাইড যদিও কিছুটা সলিড (তরল বা বায়বীয় আকারে নয় এমন কঠিন) আকার ধারণ করে কিন্তু এতে বাতাসের স্বাভাবিকতা বজায় থাকে না। তাই এই বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে এমন একসময় আসবে যখন ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয় দেখা দিবে।

 

3. মশা ও ম্যালেরিয়া জীবাণুর জিন বিন্যাস আবিষ্কার : 

মানুষের বিশেষ করে প্রাণীদের জিন নিয়ে গবেষণায় সারা বিশ্বে যে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি সম্প্রতি সেক্ষেত্রে এক ব্যতিক্রমী ধারার সূচনা করেছেন জিন গবেষকরা। তারা এবার মশা এবং ম্যালেরিয়া-জীবাণুর জিন গবেষণা শুরু করেছেন। শুধু তাই নয় এক্ষেত্রে তারা ইতোমধ্যে বেশ সাফল্য অর্জন করেছেন। গত ৬ বছর যাবত পরিচালিত এই গবেষণার মাধ্যমে এই গবেষকরা রক্তশোষক মশা ‘এনোফিলিস গ্যাম্বি’ এবং ম্যালেরিয়া সৃষ্টিকারী পরজীবী প্লাজমোডিয়াম ফলস্পিরাস-এর ডিএন’র বিন্যাস জানতে পেরেছেন। এরপর এই বিজ্ঞানীরা বলেছেন এই জিন সিকোয়েন্সের মাধ্যমে ম্যালেরিয়া নিরাময় এবং প্রতিরোধে আরো কার্যকর ওষুধ ও মশানাশক তৈরি করা সম্ভব হবে।
বিশেষ করে গ্রীষ্মপ্রধান দরিদ্র দেশগুলোতে যেভাবে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে প্রতিবছর লাখ লাখ (১০ লাখ) লোক মারা যায় অতিদ্রুত এই জিন বিন্যাস ব্যবহার করে সেসব দেশে কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা যাবে।
বিজ্ঞানীদের এই গবেষণা রিপোর্ট প্রকাশ পাবার পর যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞান বিষয়ক গণমাধ্যগুলোতে নতুন করে আবার সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
ইতোমধ্যে অনেকেই বিজ্ঞানীদের এই গবেষণাকর্মকে স্বাগত জানিয়েছেন। আবার কেউ কেউ সমালোচনা করলেও দ্রুত নতুন এই প্রযুক্তির বাস্তবসম্মত প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন। কারণ এর ফলে এই প্রযুক্তি যেমনি বাস্তবতা পাবে তেমন মশার আক্রমণ প্রতিরোধে যেসব ওষুধ বর্তমানে ব্যবহৃত হয় এগুলোর দ্বারা এই জনআহতকর পরিস্থিতির শিকার থেকে মানুষ রেহাই পাবেন।

Leave a Reply