ইতিহাসের সেরা কিছু মুসলিম বিজ্ঞানী আর তারা যে কারনে বিখ্যাত।পর্ব ৭


আসসালামু আলাইকুম

আশা করছি আপনারা সবাই আল্লাহর রহমতে ভালো আছেন।

আমার আগের সব পর্ব:-

পর্ব ১:- ইতিহাসের সেরা কিছু মুসলিম বিজ্ঞানী আর তারা যে কারনে বিখ্যাত।পর্ব ১

পর্ব ২:- ইতিহাসের সেরা কিছু মুসলিম বিজ্ঞানী আর তারা যে কারনে বিখ্যাত।পর্ব ২

পর্ব ৩:-ইতিহাসের সেরা কিছু মুসলিম বিজ্ঞানী আর তারা যে কারনে বিখ্যাত।পর্ব ৩

পর্ব ৪:-ইতিহাসের সেরা কিছু মুসলিম বিজ্ঞানী আর তারা যে কারনে বিখ্যাত।পর্ব ৪

পর্ব ৫:-ইতিহাসের সেরা কিছু মুসলিম বিজ্ঞানী আর তারা যে কারনে বিখ্যাত।পর্ব ৫

পর্ব ৬:-ইতিহাসের সেরা কিছু মুসলিম বিজ্ঞানী আর তারা যে কারনে বিখ্যাত।পর্ব ৬

13.নাসির আল দীন আল তুসি(ত্রিকোণমিতির স্রষ্টা,জিজ-ইলখানি উপাত্তের উদ্ভাবক)

মুসলমানদের নিউটন নাসির উদ্দীন তুসী একাধারে দার্শনিক, গাণিতিক, চিকিৎসাবিদ, জ্যোতির্বিদ, কবি ও রাজনীতিবিদি ছিলেন। তিনি ১২০১ খৃস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে খােরসানের তুস নগরে জন্মগ্রহণ করেন। তার পুরাে নাম ছিল আবু জাফর মােহাম্মদ ইবনুল হাসান নাসির আলী তুসী আল মহাক্কিক।তিনি আল-তুশি নামেই সমধিক পরিচিত ।

আল-তুশি অনুপম জনপ্রিয়তা ও খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তিনি খ্যাতি অর্জন করেছিলেন তাঁর অসাধারণ জ্ঞানার্জনের জন্যে। তিনি গণিত জগতের এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। চিকিৎসা বিদ্যায়ও তিনি অর্জন করতে সক্ষম হন অগাধ জ্ঞান।

আইনবিদ্যা ও নীতি-দর্শন বিদ্যায়ও তাঁর জ্ঞান ছিল অগাধ। জীবনের শেষ প্রান্তে তিনি অর্জন করেন অসাধারণ সাফল্য। জ্যোতির্বিদ্যায় তাঁর অবদান অপরিমেয়। ত্রিকোণােমিতিতেও তার অবদান একই ধরনের। তিনি সে সময়ের বিখ্যাত পণ্ডিত কামাল উদ্দিন ইবনে ইউসূফ ও সমসাময়িক বিখ্যাত বিজ্ঞানী ও দার্শনিকের কাছে। শিক্ষা লাভের সুযােগ পান।

তুশি’র কর্মজীবন শুরু নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে।১২৩০ সালে মঙ্গোলরা তুস আক্রমণ করলে আল তুসি পালিয়ে যান এবং ইসম’লি দুর্গে আশ্রয় নেন। সেখানেই তিনি পরবর্তী ২৫ বছর বিভিন্ন গবেষণা এবং পর্যবেক্ষণ করে কাটিয়ে দেন।

১২৫৬ সালে হালাকু খানের নেতৃত্বে মঙ্গোলরা ইসম’লি দখল করে নেয় এবং আল তুসিকে বন্দী করে। অবশ্য তুসির গুণমুগ্ধ হয়ে হালাকু খান তুসিকে নিজের উপদেষ্টা নিয়োগ দেন।

হালাকু খানের সাথে আল তুসির জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। তিনি ১২৫৯ সালে হুলেগু খানকে রাজি করিয়ে আজারবাইজানে তৎকালীন সবচেয়ে উন্নত মানমন্দির স্থাপন করেন, যা আজও স্বমহিমায় বিদ্যমান। এ সময় তিনি রাত জেগে আকাশ পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি দিনভর আর্কিমিডিস, টলেমি, হাইপেসিস, অটোলিকাস, মেনেলাস, থিওডিসিয়াসের মতো বিজ্ঞানী এবং জ্যোতির্বিদদের গ্রন্থ অনুবাদ করেন।

এই মানমন্দির থেকে তিনি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে একটি নিখুঁত অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল টেবিল তৈরির চেষ্টা করেন, যেন নির্ভুল জ্যোতিষশাস্ত্রীয় গণনা করা যায়। তার বই ‘জিজ-ই-ইলখানি’তে তিনি গ্রহ নক্ষত্রের গতিবিধি সম্বন্ধীয় বেশ নিখুঁত একটি ছক তৈরি করেন, যা তার সময়ের সবচেয়ে নির্ভুল ছক বলে গণ্য করা হতো।

তাছাড়া কোপার্নিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক সৌরমডেলের পূর্ব পর্যন্ত, আল তুসির সৌরমডেলই ছিল সবচেয়ে উন্নত এবং অধিক ব্যবহৃত মডেল। তাই মুসলিমদের নিকট আল তুসি ছিলেন টলেমির চেয়েও জনপ্রিয়।

তুসীকে জ্যোতির্বিজ্ঞান ও অন্যান্য প্রয়ােজনীয় বিজ্ঞান সম্পর্কে হালাকু খান একটি জিজ’ প্রস্তুত করতে আদেশ দেন। হালাকু খানের সঙ্গে তুসী আপােস মীমাংসার ৩০ বছরের স্থলে ১২ বছরের সময় নিয়ে জিজ প্রস্তুত করে দেন।

অবশেষে তিনি জ্যোতির্বিদ্যা বিষয়ক একটি উপাত্ত উদ্ভাবন করেন। এই উপাত্ত ভবিষ্যৎ জ্যোতির্বিদ্যার জন্যে আলােকবর্তিকা হিসেবে কাজ করে। এমনকি কোপারনিকাসকেও তাঁর এই উপাত্তের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। এর উদ্ভাবক এই উপাত্ত উৎসর্গ করেছিলেন এর পৃষ্ঠপােষকের নামে। অদম্য হালাকু খান ইল খান নামেও পরিচিত ছিলেন। সে জন্যে এই উপাত্ত বা টেবল-এর নাম দেয়া হয় Jij ilKhani।

আল তুসি সফলভাবে বিষুবরেখার বার্ষিক অয়নচলনও পরিমাপ করতে সক্ষম হন। তাছাড়া অ্যাস্ট্রোল্যাব যন্ত্রের উন্নয়নে ভূমিকা রাখেন তুসি। তবে আমাদের ছায়াপথ আকাশগঙ্গা নিয়ে তুসির পর্যবেক্ষণ ছিল অসাধারণ।

তিনি বলেন, আকাশগঙ্গা অগণিত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র, ক্ষীণ আলোর (দূরবর্তী তারকাগুলো ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর মনে হয়) তারকার সমন্বয়ে গঠিত, যেগুলো অত্যন্ত কাছাকাছি গুচ্ছাকারে অবস্থান করছে। তার এই পর্যবেক্ষণের তিন শতাব্দী পর গ্যালিলিও নিজের টেলিস্কোপ দ্বারা পর্যবেক্ষণ করে নিশ্চিত করেন যে, আমাদের ছায়াপথ প্রকৃতপক্ষেই অসংখ্য ক্ষীণ আলোর তারকা দ্বারা গঠিত। তবে দূরত্ব বিষয়ক পর্যবেক্ষণটি ছিল ভুল। কেননা এখন আমরা জানি যে, সে তারকাগুলোর মধ্যে দূরত্বও অনেক বেশি।

তুশিই ছিলেন প্রথম ব্যক্তি, যিনি টলেমীয় জ্যোতির্বিদ্যার ভুল-ত্রুটি ধরতে সক্ষম হন। তিনি এগুলাে সংশােধনও করেন। কোপারনিকাস তা অনুসরণ করেন। তুশি’র আইন বিদ্যা বিষয়ক বই আল-তুশির নাম ব্যাপকভাবে পরিচিত করে তােলে।

এই বইটির নাম ছিল : Akhlak-E-Namiree । কয়েক শতাব্দী ধরে এই বইয়ের জ্ঞান ছিল শিক্ষার্থীদের জ্ঞানাধার । এটি ছিল একটি বিখ্যাত বই। বইটি অসাধারণ জনপ্রিয়তাও লাভ করেছিল। তিনি ইসলামী দর্শন সম্পর্কে একটি সৃজনশীল বই লিখে গেছেন। এর নাম : Tajrid-al-Akhlak। এই বইটিও খুব জনপ্রিয় ছিল।

আল তুসির সময়ে ত্রিকোণমিতিকে গণিতের কোনো আলাদা শাখা মনে করা হতো না। বরং জ্যোতির্বিজ্ঞানে এর অত্যন্ত কার্যকরী ব্যবহারের জন্য ত্রিকোণমিতিকেও জ্যোতির্বিজ্ঞানেরই একটি শাখা গণ্য করা হতো।

আল তুসি ‘ট্রিটিস অন কোয়াড্রিলেটারাল’ রচনা করে এই ধারণা পাল্টে দেন। তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানকে সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে শুধুমাত্র গোলকীয় ত্রিকোণমিতির উপর অসাধারণ এই বইটি রচনা করেন। আর তাতেই ত্রিকোণমিতি জ্যোতির্বিজ্ঞান থেকে আলাদা হয়ে, বিশুদ্ধ গণিতের নিজস্ব এক শাখা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

আল তুসিই প্রথম ব্যক্তি যিনি গোলকীয় ত্রিকোণমিতিতে ছয়টি পৃথক ত্রিভুজের তালিকা তৈরি করেন। তবে ত্রিকোণমিতিতে উনার সবচেয়ে বড় সাফল্য হচ্ছে, গোলকীয় ত্রিভুজের জন্য ‘ল অব সাইন’ বা সাইন সূত্র এবং ‘ল অব ট্যানজেন্ট’ বা ট্যানজেন্ট সূত্র আবিষ্কার। শুধু আবিষ্কারই করেননি, এই দুটি সূত্রের পক্ষে প্রমাণও দেন আল তুসি। উচ্চ মাধ্যমিক গণিত বইয়ের কল্যাণে আমরা সকলেই এই সূত্র দুটির সাথে পরিচিত।

বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখায় ও তুশির অবদান বিষ্ময়কর । নিন্মোক্ত উক্তিটির মাধ্যমে উনার জ্ঞানের গভীরতা সম্পর্কে ধারনা পাওয়া যায়। যেমন আল তুসি বলেছিলেন,

“একটি বস্তু বা সত্তা কোনো অবস্থাতেই সম্পূর্ণরূপে বিলীন হতে পারে না। এর কেবল গঠন, অবস্থা, আকার, রঙ এবং অন্যান্য বাহ্যিক বা আভ্যন্তরীণ ধর্মের পরিবর্তন ঘটে।”
এই উক্তিটি দ্বারা আল তুসি, একইসাথে পদার্থবিজ্ঞানের শক্তির অবিনশ্বরতা নীতি আর রসায়নের ভরের নিত্যতার নীতির সমর্থন করেছেন!

যুক্তিশাস্ত্রে তিনি ইবনে সিনার একনিষ্ঠ সমর্থক ছিলেন। ইবনে সিনার ‘ইশারাত’ গ্রন্থের উপর তিনি একটি প্রশংসাসূচক প্রবন্ধ ও রচনা করেছিলেন যার নাম ‘শারহ আল ইশারাত’ রচনা করেছেন।

চার্লস ডারউইনের ‘ন্যাচারাল সিলেকশন’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৫৯ সালে। আল তুসির প্রায় ৬০০ বছর আগেই বিবর্তনবাদের মৌলিক কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন! ডারউইন তার ‘অরিজিন অব স্পিসিস’ গ্রন্থে আল তুসির কাজের প্রতি কৃতজ্ঞতাও স্বীকার করেছেন, যা অধিকাংশেরই অজানা।

আল তুসি তার ‘আখলাক-ই-নাসরি’ গ্রন্থে বিবর্তন নিয়ে যে আলোচনা করেছেন, তা অবশ্য ডারউইনের আলোচনার চেয়ে ভিন্ন। কেননা তিনি মহাবিশ্ব সৃষ্টি ও এর বিবর্তনের উপর গুরুত্বারোপ করেন যেখানে ডারউইন আলোচনা করেছেন প্রাণীর বিবর্তন নিয়ে।

তুসির মতে, সৃষ্টির শুরুর দিকে মহাবিশ্ব গড়ে উঠেছিল সমপরিমাণ এবং সমরূপ পদার্থ দিয়ে। কিন্তু দ্রুতই আভ্যন্তরীণ অসঙ্গতি শুরু হয় এবং বিভিন্ন পদার্থের মধ্যে পরিবর্তন শুরু হয়। কিছু পদার্থের পরিবর্তন দ্রুত এবং ভিন্ন উপায়ে ঘটতে থাকে। আর পরিবর্তনের এই ভিন্নতার কারণেই ভিন্ন ভিন্ন পদার্থ বিবর্তিত হয়ে খনিজ, বৃক্ষ, প্রাণী, মানুষের সৃষ্টি হয়। আর জৈবিক বিবর্তনের জন্য বংশগত পরিবর্তনশীলতার প্রয়োজনীয়তাও তিনি ব্যাখ্যা করেন। প্রতিকূল পরিবেশে কীভাবে প্রাণী অভিযোজিত হয়, তা নিয়েও আলোচনা করেন তুসি।

অভিযোজনের ব্যাপারটি পরিষ্কার করতে তুসি তার চারপাশের পশুপাখির উদাহরণ টানেন। জীবন ধারণের জন্য এবং প্রতিরক্ষার জন্য এদের দেহে এমন কিছু অঙ্গ রয়েছে, যেগুলো প্রকৃত অস্ত্রের মতোই কাজ করে। শিং যা বর্শার মতো কাজ করে; দাঁত এবং থাবা কাজ করে ছুরি হিসেবে; খুর কাজ করে গদার মতো। আবার যেসব প্রাণীর এ ধরনের অঙ্গ নেই, প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে তাদের রয়েছে তীক্ষ্ণ বুদ্ধি এবং দ্রুত পলায়নের ক্ষমতা, যেমন শেয়াল। আবার যে সকল প্রাণীর দ্রুত পালাবার ক্ষমতাও নেই, তারা দল বেঁধে বাস করে শত্রুর মোকাবিলা করার জন্য, যেমন পিঁপড়া।

আল তুসির মতে, পৃথিবীতে তিন ধরনের জীব রয়েছে- বৃক্ষ, প্রাণী (পশুপাখি) এবং মানুষ। মানুষকে তিনি আলাদা শ্রেণীতে স্থাপন করেছেন। কারণ তার মতে, মানুষ বিবর্তনের মধ্যভাগে রয়েছে। মানুষের বিবর্তন সম্পর্কে তার ব্যাখ্যা-

“মানুষের কিছু বৈশিষ্ট্য তাকে অন্য সকল জীব থেকে আলাদা করে, কিছু বৈশিষ্ট্য আবার পশুর মতো বানিয়ে দেয়, কিছু বৈশিষ্ট্য আছে যেগুলো বৃক্ষের বৈশিষ্ট্যের প্রতিফলন। এসবই প্রমাণ যে, মানুষ ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে এবং পরিপূর্ণতার দিকে ধাবিত হচ্ছে। পূর্বে, পার্থক্য কেবল প্রাণীর প্রকৃতির মধ্যে ছিল। এরপর পার্থক্য গড়ে দেয় পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা এবং জ্ঞান। একসময় পার্থক্য গড়ে দেবে আত্মিক পরিশুদ্ধিতা। মানুষ এখনো নিম্ন শ্রেণীর প্রাণীর সাথে সম্পর্কযুক্ত। তবে নিজেদের প্রচেষ্টায় তারা একদিন আত্মিক পরিশুদ্ধিতা লাভ করবে, উচ্চ স্তরে পৌঁছে যাবে।”

তাঁর আবিষ্কার ও উদ্ভাবনা সম্পর্কিত বইয়ের সংখ্যা অজানা। ব্রুকম্যানের মতে, তাঁর বইয়ের সংখ্যা ৫৬। শার্টন বলেছেন, এ সংখ্যা ৬৪। এর চার ভাগের এক ভাগই জোতির্বিদ্যা সম্পর্কিত। বাকিগুলাে অন্যান্য বিষয়ের। বইগুলাে আরবিতে ও ফার্সিতে । এগুলাের অনুবাদ হয়েছে লাতিন ও অন্যান্য ইউরােপীয় ভাষায়। এগুলাে ছাপা অবস্থায় পাওয়া যেতাে।

তুশিকে বাদ দিয়ে বিজ্ঞান ও দর্শনের আলােচনা চলতে পারে না। তিনি শেষ জীবনে বাগদাদ গিয়েছিলেন। এই নগরী একদিন তার পৃষ্ঠপােষক হালাকু খানই লুণ্ঠন করে নিয়ে যান। সম্ভবত তিনি ১২৭৪ খৃষ্টাব্দে মারা যান। তার মৃত্যুতে যেনাে একটি আলােকবর্তিকার পতন ঘটে।

Leave a Reply