[পর্ব১২]ইতিহাসের সেরা কিছু মুসলিম বিজ্ঞানী আর তারা যে কারনে বিখ্যাত।[আবুল কাসিম আল জাহারাবী:-অপারেটিভ/আধুনিক সার্জারীর জনক]


আসসালামু আলাইকুম

আশা করছি আপনারা সবাই আল্লাহর রহমতে ভালো আছেন।

আমার আগের সব পর্ব:-

ইতিহাসের সেরা কিছু মুসলিম বিজ্ঞানী আর তারা যে কারনে বিখ্যাত।পর্ব ১

ইতিহাসের সেরা কিছু মুসলিম বিজ্ঞানী আর তারা যে কারনে বিখ্যাত।পর্ব ২

ইতিহাসের সেরা কিছু মুসলিম বিজ্ঞানী আর তারা যে কারনে বিখ্যাত।পর্ব ৩

ইতিহাসের সেরা কিছু মুসলিম বিজ্ঞানী আর তারা যে কারনে বিখ্যাত।পর্ব ৪

ইতিহাসের সেরা কিছু মুসলিম বিজ্ঞানী আর তারা যে কারনে বিখ্যাত।পর্ব ৫

ইতিহাসের সেরা কিছু মুসলিম বিজ্ঞানী আর তারা যে কারনে বিখ্যাত।পর্ব ৬

[পর্ব ৭] ইতিহাসের সেরা কিছু মুসলিম বিজ্ঞানী আর তারা যে কারনে বিখ্যাত।[নাসির আল দীন আল তুসি:-ত্রিকোণমিতির স্রষ্টা,জিজ-ইলখানি উপাত্তের উদ্ভাবক]

[পর্ব ৮] ইতিহাসের সেরা কিছু মুসলিম বিজ্ঞানী আর তারা যে কারনে বিখ্যাত।[আবুল ওয়াফা:-ত্রিকোণমিতির মূল স্থপতি]

[পর্ব ৯]ইতিহাসের সেরা কিছু মুসলিম বিজ্ঞানী আর তারা যে কারনে বিখ্যাত।[আবু মারওয়ান/ইবনে জহুর:-পরভূক জীবাণু বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠাতা,পরীক্ষামূলক সার্জারির জনক, পরীক্ষামূলক শারীরবৃত্তীয়, মানুষের ব্যবচ্ছেদ, অটোপস এর অগ্রদূত]

[পর্ব ১০]ইতিহাসের সেরা কিছু মুসলিম বিজ্ঞানী আর তারা যে কারনে বিখ্যাত।[আল মাওয়ার্দি:-বিশুদ্ধতম গণতন্ত্রের প্রবক্তা]

[পর্ব ১১]ইতিহাসের সেরা কিছু মুসলিম বিজ্ঞানী আর তারা যে কারনে বিখ্যাত।[আল জাজারি:-মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ প্রযুক্তিবিদ]

18.আবুল কাসিম আল জাহারাবী(অপারেটিভ/আধুনিক সার্জারীর জনক)

আবুল কাসেম খালাফ ইবনে আল-আব্বাস আল-জাহরাবী।তিনি মধ্যযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ সার্জন হিসাবে বিবেচিত।মধ্যযুগীয় মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে মহৎ শল্যবিদ। তাঁকে আধুনিক শল্যচিকিৎসার জনক বলেও গণ্য করা হয়।

৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে স্পেনের আন্দালুসিয়ার আজ-জাহরা শহরে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতা সম্ভবত আল-আনসারি গোত্রের সদস্য ছিলেন।তার শৈশব এবং শিক্ষা সম্পর্কে কোনো তথ্যই আমাদের হাতে নেই। যত দূর জানা যায়, জীবনের প্রায় পুরো সময়ই তিনি স্পেনের কর্ডোভায় কাটিয়েছেন। এ শহরেই তিনি শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন ডাক্তারি।

আন্দালুসিয়ার খলিফা দ্বিতীয় আল-হাকামের রাজচিকিৎসক ছিলেন তিনি।রাজদরবারে কাজ করবার সময়ই তিনি তার অধিকাংশ চিকিৎসা সংক্রান্ত যন্ত্রপাতি তৈরি করেন। তার এসব যন্ত্রপাতির জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞান তার নিকট যেমনই ঋণী, তেমনি স্মরণে রাখতে হবে খলিফা আল হাকামের নামও। তার পৃষ্ঠপোষকতায়ই এতকিছু করতে পেরেছিলেন জাহরাবী।

তার কর্মজীবন সম্পর্কে যতটুকু তথ্যই আমরা পেয়েছি, সেগুলো তার মৃত্যুর অর্ধশতক পর আল হুমায়দি নামক এক ইতিহাসবিদ লিখে গেছেন।

“আবুলকাসিসের চিকিৎসাপদ্ধতি এতটাই উন্নত ছিল যে সেগুলোর কাছে গ্যালেনের চিকিৎসাপদ্ধতিও হয়ে যায়! ইউরোপীয়রা অন্ধের মতো অনুকরণ করতে শুরু করে তাকে। তার দেখানো পথে চলেই ইউরোপে শল্যচিকিৎসা আজকের পর্যায়ে পৌঁছেছে!” – চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসবিদ ডোনাল্ড ক্যাম্পবেল

ইতিহাসবিদদের মতে, তিনি নিজেই তাঁর আত্মজীবনী লিখে গিয়েছিলেন। তা ছাড়া তাঁর জীবদ্দশায় অনেকেই তাঁকে নিয়ে লিখেছেন। দুর্ভাগ্যক্রমে, ক্যাস্টিলিয়ান ও আন্দালুসিয়ানদের মধ্যকার যুদ্ধে আজ-জাহরা শহর ধ্বংস হয়ে যায়। এর মধ্য দিয়ে চিরতরে হারিয়ে যায় এসব অমূল্য তথ্যও।সাথে তার ব্যক্তিগত তথ্যাদি পাবার রাস্তাও চিরতরে বন্ধ হয়।

তিনিই সর্বপ্রথম হিমোফিলিয়া (Haemophilia) বর্ণনা করেন। তিনি সার্জারির জন্য এনাটমিকে (Anatomy) একটি অবশ্য পঠিতব্য বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেন।
পড়ে যাওয়া দাঁতের পুনঃস্থাপন
এবং কৃত্রিম দাঁত হিসেবে গরুর হাড়ের
ব্যবহার তাঁর অন্যতম অবদান।
জাহরাবীই প্রথম সার্জন যিনি রক্ত বন্ধ
করার জন্য সার্জিক্যাল
ড্রেসিং হিসেবে,প্যাড
হিসেবে এবং দাঁতের চিকিৎসায়
তুলা ব্যবহার করেন।

তিনিই প্রথম যৌননালী অপারেশনের (Vaginal
Operation), লিথোটমি পজিশন (Lithotomy
position) শিক্ষা দেন।
তিনি ট্রাকিওস্টমি (Tracheostomy)
বর্ণনা করেন,গয়টার (Goitre)
এবং থাইরয়ডের ক্যান্সারের (Thyroid
cancer) পার্থক্য সুস্পষ্টভাবে নির্দেশ
করেন।তিনিই প্রথম কেনুলা (Cannulae)
আবিষ্কার করেন

রক্তপাত বন্ধ করার জন্য আয়রন
কটরাইজেশন (Iron cauterization) তার
উদ্ভাবন। স্ফীত শিরার পৃথকীকরণ
সংক্রান্ত তাঁর সেই সময়ের বর্ণনা আজ
হাজার বছর পর আধুনিক সার্জারির অনুরূপ।

আল জাহারাবী হচ্ছে প্রথম সার্জন যিনি অভ্যন্তরীণ স্টিচিংয়ের জন্য catgut( cat intestines) ব্যবহার করেছেন।এই উপাদানটি প্রাণীর অন্ত্রের আস্তরণ থেকে তৈরি।এখনও আধুনিক শল্য চিকিৎসায় এটি ব্যবহৃত হয়।তিনিই প্রথম ইউরোপে সার্জিকেল বিদ্যার প্রচলন ঘটান।

চিকিৎসকদের মধ্যে তিনিই সর্বপ্রথম এক্টোপিক গর্ভধারণ নিয়ে বর্ণনা করেছেন। উল্লেখ্য, জরায়ুর বাইরে যেকোনো স্থানে গর্ভধারণ হলে তাকে এক্টোপিক গর্ভধারণ বলে। জরায়ু সম্প্রসারণের জন্য প্রথম সফল অস্ত্রোপচার করেছিলেন এই কিংবদন্তি।

এ ছাড়া মৃত ভ্রূণ বের করার যন্ত্রটিও সর্বপ্রথম তিনিই আবিষ্কার করেছেন।
পৃথিবীতে প্রথম হাইড্রোসেফালাস সমস্যার (বড় মাথার রোগ) সমাধানও তিনিই উদ্ভাবন করেছিলেন। হাইড্রোসেফালাস রোগটি সাধারণত শিশু ও বৃদ্ধদের বেশি হয়। এই সমস্যাকে অনেক সময় ‘মাথায় পানি জমা’ও বলা হয়। জাহরাবী তাঁর ‘কিতাবুল তাসরিফে’ অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান সবিস্তারে তুলে ধরেছেন।

ইউরোলজিতেও তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। তিনিই প্রথম লিথোটমি বা কাটাছেঁড়াবিহীন মূত্রথলির পাথর অপসারণ পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। তাঁর আবিষ্কৃত ‘মিশাব’ যন্ত্র (যা অনেকটাই আধুনিক যুগের লিথোট্রাইটের মতো)। এটি ব্যবহার করে কোনো রকম কাটাছেঁড়া ছাড়াই মূত্রথলির ভেতরেই পাথর ভেঙে ফেলা হতো।

এ ছাড়া তিনি মাথার আঘাত, মাথার খুলির অস্থিতে ফাটল, মেরুদণ্ডীয় জখম চিকিৎসায় বেশ পটু ছিলেন। এসব চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের জন্য তিনি এমন কিছু চিকিৎসা সরঞ্জাম ও প্রায়োগিক পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলেন, যেগুলোর একটা বড় অংশ এখনো নিউরোসার্জারিতে ব্যবহৃত হয়!


পৃথিবীতে প্রথম সফলভাবে দাঁত ট্রান্সপ্লান্ট করে দেখিয়েছিলেন তিনি। তিনি ব্রোঞ্জ ও রুপা দিয়ে দাঁত বাঁধাই করতেন। এসব অস্ত্রোপচারে তিনি যেসব সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেছেন, সেগুলোর একটি বড় অংশ আজও ব্যবহৃত হচ্ছে।

চিকিৎসাশাস্ত্রে তাঁর অবদান এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে রেনেসাঁর সময়ের এক বিখ্যাত শল্যচিকিৎসক পিয়েত্রো আরগালাতা বলেছেন, ‘নিঃসন্দেহে তিনি সব শল্যচিকিৎসকের মাস্টার!’ এ ছাড়া ফ্রান্সের সর্বশ্রেষ্ঠ শল্যচিকিৎসক গাই ডি কলিক তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের নবদিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে তাঁর লিখিত ‘কিতাবুল তাসরিফ’-এর মাধ্যমে। এটি ছিল চিকিৎসাসংক্রান্ত ৩০ খণ্ডের বিশ্বকোষ।আন্দালুসিয়ার খলিফা দ্বিতীয় আল-হাকামের উদ্যোগে আবুল কাসেমের ৫০ বছর নিরলস পরিশ্রমের ফল এই অমূল্য গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়।

সার্জারি থেকে শুরু করে মেডিসিন, ফার্মাকোলজি, অপথালমোলজি, অর্থোপেডিকস, প্যাথলজি, দন্তবিজ্ঞান, পুষ্টিবিজ্ঞান, শিশু চিকিৎসা—সবই স্থান পেয়েছে তাঁর এই গ্রন্থে।প্রতিটি ভলিউমে ওষুধের বিভিন্ন দিক নিয়ে বলা হয়েছে এবং 300 টিরও বেশি রোগের বর্ণনা এবং সেইসাথে তার চিকিৎসাগুলির বর্ণনাও এর মধ্যে পাওয়া যায়।

আত-তাসরীফ দুই খন্ডে বিভক্ত। প্রথম খন্ডে এনাটমি, ফিজিওলজি ও ডায়াবেটিকস সম্পর্কে আলোচনা রয়েছে। ২য় খন্ডে সার্জারী সক্রান্ত বিষদ বিবরণ রয়েছে। বিখ্যাত গবেষক G. Sarton তাঁর এই গ্রন্থকে Medical Encyclopadia আখ্যায়িত করেছেন।

তাঁর রচিত ‘কিতাবুল তাসরিফ’ গ্রন্থে দুই শতাধিক অস্ত্রোপচারের সচিত্র বর্ণনা দিয়ে সে সময়কার চিকিৎসকদের বিস্ময়ে বিমূঢ় করে দেন তিনি। বর্তমান সময়েও সেগুলো চিকিৎসকদের বিস্মিত করে। তাঁর আবিষ্কৃত যন্ত্র কিছু কিছু বিষয়ে এখনো ব্যবহার করা হয়।

আল-জাহারাবি 200 টিরও বেশি অস্ত্রোপ্রচার যন্ত্র প্রবর্তন করেছিলেন। যার মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরণের scalpels, retractors, curettes, pincers, specula.তিনি অস্ত্রোপচারে ব্যবহারের জন্য ডাবল ডগা সহ হুকগুলিও আবিষ্কার করেছিলেন। এর মধ্যে অনেকগুলি আগে কখনও কোনও সার্জন ব্যবহার করেনি।শল্যচিকিৎসার প্রক্রিয়া ও যন্ত্র নিয়ে তাঁর অবদান প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে আধুনিক কালেও প্রভাব ফেলেছে।

বইটি 12 তম শতাব্দীতে ক্রেমনার জেরার্ড লাতিন ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন । এটি শীঘ্রই ইউরোপে জনপ্রিয়তা পেয়েছে এবং Salerno এবং Montpellier এর মতো বড় বড় মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে একটি স্ট্যান্ডার্ড পাঠ্য হয়ে উঠে। পরবর্তী 500 বছর ধরে ইউরোপে অস্ত্রোপচারের প্রাথমিক উৎস হিসাবে বইটি পড়ানো হতো।

কর্ডোভায় যে গলিতে তিনি বসবাস করতেন, সে গলিটির নামকরণ করা হয়েছে ‘আবুলকাসিস স্ট্রিট’। এমনকি যে বাড়িটিতে তিনি বসবাস করতেন, সে বাড়িও সংরক্ষণ করেছে স্পেন সরকার। আধুনিক শল্যচিকিৎসার জনক এই মহান চিকিৎসাবিজ্ঞানীর বাড়ির সামনে একটি ব্রোঞ্জ প্লেট লাগানো আছে, যাতে লেখা, “এটিই সেই বাড়ি, যেখানে আল জাহরাবী বসবাস করতেন।” সর্বোপরি, শল্যচিকিৎসা আলাদা করে না বলে, চিকিৎসাশাস্ত্রই আল জাহরাবীর নিকট ঋণী বললে একটুও অত্যুক্তি হবে না।

সংক্ষেপে, আল-জাহরাবী চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিশেষত সার্জারি শাখায় অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। আল-জাহরাবী দ্বারা প্রবর্তিত কিছু উদ্ভাবন আজও ব্যবহৃত হচ্ছে বা খুব দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যবহৃত হয়েছিল।

মৃত্যুর কয়েক বছর আগে সম্ভবত ১০১০ খ্রিস্টাব্দে তিনি কর্ডোভা ছেড়ে আজ-জাহরা শহরে স্থানান্তরিত হন এবং বাকি জীবনটা সেখানেই কাটান। এ শহরেই ১০১৩ খ্রিস্টাব্দে পরলোকগমন করেন মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ এই শল্যচিকিৎসক।

Leave a Reply